বর্তমান ডিজিটাল যুগে ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অফিসের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম—প্রতিদিনই আমাদের অসংখ্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হয়। এতগুলো পাসওয়ার্ড মনে রাখার ঝামেলা এড়াতে অনেকেই সব জায়গায় একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। এটি সহজ মনে হলেও সাইবার নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অভ্যাস।
ধরুন, আপনি একটি কম গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটে যে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেছেন, সেটিই আপনার ই-মেইল, ফেসবুক কিংবা ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টেও ব্যবহার করছেন। যদি ওই ওয়েবসাইটের ডেটাবেজ হ্যাক হয় এবং আপনার লগইন তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে একই ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে হ্যাকাররা সহজেই আপনার অন্য অ্যাকাউন্টগুলোতেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। সাইবার নিরাপত্তায় এই কৌশলকে ক্রিডেনশিয়াল স্টাফিং (Credential Stuffing) বলা হয়।
বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা গবেষণায় দেখা গেছে, তথ্য ফাঁসের একটি বড় অংশের পেছনে দুর্বল বা চুরি হওয়া পাসওয়ার্ড দায়ী। হ্যাকাররা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহার করে চুরি হওয়া ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড হাজারো ওয়েবসাইটে পরীক্ষা করে। ফলে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করলে একটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার পুরো ডিজিটাল পরিচয় ঝুঁকির মুখে পড়ে।
অনেক ব্যবহারকারী একাধিক অ্যাকাউন্টে একই রিকভারি ই-মেইল, ফোন নম্বর কিংবা নিরাপত্তা প্রশ্ন ব্যবহার করেন। কোনো একটি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারালে এসব তথ্যের মাধ্যমে অন্যান্য অ্যাকাউন্টেও অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা করা হতে পারে। তাই শুধু পাসওয়ার্ড নয়, অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের তথ্যও নিরাপদ রাখা জরুরি।
ফিশিং আক্রমণে হ্যাকাররা জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া লগইন পেজ তৈরি করে ব্যবহারকারীদের পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে। যদি একই পাসওয়ার্ড একাধিক সেবায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে তথ্য দেওয়ার ভুল থেকেই ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত তথ্যের জন্যই নয়, কর্মক্ষেত্রের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সার, রিমোট কর্মী কিংবা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে অফিসের ই-মেইল, ক্লাউড স্টোরেজ, গ্রাহকের তথ্য বা ব্যবসায়িক টুলও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করলে জটিল ও ভিন্ন পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করা সহজ হয়। সম্ভব হলে সব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) চালু রাখা উচিত, যাতে পাসওয়ার্ড ফাঁস হলেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর হ্যাকারদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সহায়তা করে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সহজ অভ্যাসই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে—কখনোই সব অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না।